ই-জিপিতে ডিজিটাল স্বাক্ষর (DSC/PKI) ও পাসওয়ার্ড-স্বাক্ষর: কোনটা কোথায় লাগে
"ডিজিটাল স্বাক্ষর ছাড়া কি ই-জিপিতে টেন্ডার দেওয়া যায়?" নতুন দরদাতাদের সবচেয়ে সাধারণ প্রশ্নগুলোর একটি। উত্তর হলো হ্যাঁ, কারণ e-GP-তে "স্বাক্ষর" শব্দটি আসলে দুটি আলাদা ব্যবস্থাকে বোঝায়। এই লেখায় পাসওয়ার্ড-ভিত্তিক স্বাক্ষর এবং DSC/PKI কোথায় লাগে আর কোথায় লাগে না, তা ধাপে ধাপে দেখানো হলো।
প্রতিটি দরপত্র ফরমে পাসওয়ার্ড-ভিত্তিক Sign ও Encrypt বাধ্যতামূলক, এবং তা শুধু আপনার e-GP অ্যাকাউন্টের Password দিয়েই হয়। হার্ডওয়্যার বা সফটওয়্যার টোকেন-ভিত্তিক Digital Signature Certificate (DSC/PKI) ঐচ্ছিক। দাপ্তরিক ম্যানুয়াল অনুযায়ী এর নিশ্চিত ব্যবহার চুক্তি স্বাক্ষরের ধাপে, যেখানে পোর্টাল নিজেই Digital Signature Application ডাউনলোডের সুযোগ দেয়।
বিভ্রান্তি কোথা থেকে আসে
কিছু দেশের ই-প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থায় বাধ্যতামূলক PKI স্বাক্ষর লাগে, তাই অনেকে ধরে নেন নিবন্ধনের আগেই বাজার থেকে একটি USB টোকেন বা ডিজিটাল সার্টিফিকেট কিনতে হবে। বাংলাদেশের e-GP-তে ধারণাটি সঠিক নয়। দাপ্তরিক New User Registration Manual ও e-GP System User Manual অনুযায়ী নিবন্ধন, প্রতিটি ফরম পূরণ, ফরম Sign ও Encrypt করা এবং চূড়ান্ত জমাদান, এর কোনোটিতেই বাহ্যিক DSC লাগে না। PKI-ভিত্তিক স্বাক্ষরের একমাত্র নিশ্চিত প্রয়োগ পাওয়া যায় পুরস্কার পাওয়ার পরে, চুক্তি স্বাক্ষরের ধাপে। নিবন্ধনের সাধারণ ভুলগুলো জানতে পড়ুন ই-জিপি রেজিস্ট্রেশন: নতুন দরদাতাদের সাধারণ ভুল।
দুই ব্যবস্থার পাশাপাশি তুলনা
| বৈশিষ্ট্য | পাসওয়ার্ড-ভিত্তিক Sign/Encrypt | DSC/PKI (টোকেন-ভিত্তিক) |
|---|---|---|
| বাধ্যতামূলক কিনা | হ্যাঁ, প্রতিটি দরপত্র ফরমে | না, ঐচ্ছিক |
| কী লাগে | শুধু e-GP অ্যাকাউন্টের Password | প্রাইভেট কী-সহ ডিজিটাল সার্টিফিকেট বা টোকেন এবং তা চালানোর সফটওয়্যার |
| কোথায় ব্যবহৃত হয় | প্রতিটি ফরমের Sign, Encrypt ও Save চক্রে | ফরমের ঐচ্ছিক "Sign with PKI" বাটনে; চুক্তি স্বাক্ষরে Contract Signing ট্যাবে |
| বাড়তি কেনাকাটা বা ইনস্টলেশন | লাগে না | অ্যাপ্লিকেশন ডাউনলোড ও ইনস্টল করতে হয় |
| কবে প্রয়োজন | নিবন্ধনের পর থেকে প্রতিটি দরপত্রে | সাধারণত শুধু পুরস্কার পাওয়ার পর চুক্তি স্বাক্ষরে |
প্রতিটি ফরমে পাসওয়ার্ড-স্বাক্ষর: Sign, Encrypt ও Save
Tender Submission Letter, Technical Form, BoQ বা Financial Form, যেকোনো ফরমে একই নিয়ম:
- "Fill" লিংকে ক্লিক করে প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করুন।
- "Sign" বাটনে ক্লিক করুন। পপ-আপে নিজের e-GP Password লিখে "Verify Password" চাপুন।
- স্বাক্ষর হয়ে গেলে "Encrypt" চাপুন। এরপর তথ্য আর সাধারণ লেখা (plain text) আকারে দেখা যাবে না।
- "Save" চাপুন। "Form saved successfully" বার্তার পর "Fill" লিংকের জায়গায় চারটি লিংক আসবে: Edit, View, Delete ও Encrypt।
এই চক্র প্রতিটি ফরমের জন্য আলাদাভাবে করতে হয়; একটিতে করলে অন্যটিতে প্রযোজ্য হয় না।
সংশোধনে Save নয়, Update
কোনো ফরম ঠিক করতে "Edit" চাপুন, তারপর "Decrypt" ও Password দিয়ে "Verify Password"। "Form Decrypted successfully" দেখালে তথ্য সংশোধন করে আবার Sign ও Encrypt করুন এবং শেষে "Update" চাপুন। শুধু দেখতে চাইলে "View" ব্যবহার করুন। "Delete" করলে ফরমের সব তথ্য স্থায়ীভাবে মুছে যায়, কোনো Undo নেই।
চূড়ান্ত এনক্রিপশন: যে ধাপটি সবাই ভুলে যায়
প্রথম চক্র শেষ করলেই ফরম জমার যোগ্য হয় না। জমাদানের আগে প্রতিটি ফরমের জন্য একটি দ্বিতীয় চক্র লাগে:
- তালিকায় ফরমের পাশের "Encrypt" লিংকে ক্লিক করুন।
- "Decrypt" চাপুন, Password দিয়ে "Verify Password" করুন। তথ্য মূল লেখায় দেখা যাবে, তবে শুধু পড়ার জন্য।
- যাচাই শেষে "Encrypt and Save" চাপুন এবং Instruction Message-এ "OK" দিন।
- এখন "Encrypt" লিংকের জায়গায় স্থায়ী লেখা "Encrypted" দেখাবে।
একটি ফরমেও "Encrypted" না দেখালে Final Submission করা যাবে না। এই চক্রের যুক্তি সহজ: Sign সত্যতা রক্ষা করে, Encrypt দরপত্র খোলার আগে গোপনীয়তা রক্ষা করে, আর চূড়ান্ত চক্র জমাদানের পর তথ্য লক করে রাখে। এরপর কিছু বদলাতে হলে আলাদা প্রতিস্থাপন বা সংশোধন প্রক্রিয়া মানতে হয়, যার বিবরণ আছে টেন্ডার জমাদান ও প্রত্যাহার অধ্যায়ে। ফরমগুলোর তালিকা দেখুন টেন্ডার প্রস্তুতি ও ফরম অধ্যায়ে।
"Sign with PKI" বাটন দেখলে কী করবেন
ফরমের নিচে "Sign with PKI" নামে একটি বাটন দেখা যেতে পারে। এটি ঐচ্ছিক বিকল্প পথ; বাধ্যতামূলক পাসওয়ার্ড-চক্র সম্পন্ন করলেই যথেষ্ট। যাদের বৈধ DSC আছে এবং ব্যবহার করতে চান, তাদের জন্য সাধারণ সমস্যাগুলো হলো:
- টোকেনের ড্রাইভার বা মিডলওয়্যার ইনস্টল না থাকা বা পুরোনো সংস্করণ থাকা।
- USB পোর্টে লাগানো থাকলেও টোকেন শনাক্ত না হওয়া; পোর্ট বদলে বা কম্পিউটার আবার চালু করে দেখুন।
- সার্টিফিকেটের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া। DSC-র বৈধতা সাধারণত ১ থেকে ২ বছর, তাই মৌসুম শুরুর আগেই মেয়াদ দেখে নিন।
- ব্রাউজারের প্লাগইন বা সংস্করণ অসামঞ্জস্য।
টোকেন নিয়ে শেষ মুহূর্তে আটকে গেলে পাসওয়ার্ড-চক্র দিয়েই কাজ সেরে ফেলুন।
চুক্তি স্বাক্ষরে Digital Signature Application
দরপত্রে বিজয়ী হলে PE খসড়া চুক্তি তৈরি করেন। তখন ধাপগুলো হলো:
- "Contract Signing" ট্যাবে যান এবং "Click Here" লিংক থেকে Digital Signature Application ডাউনলোড করে ইনস্টল করুন। অ্যাপ্লিকেশনের ভেতরের নির্দেশনা হুবহু অনুসরণ করুন।
- খসড়া চুক্তির "View" লিংকে ক্লিক করে "Save as PDF" দিয়ে ফাইলটি নামান।
- ইনস্টল করা অ্যাপ্লিকেশন দিয়ে ফাইলে স্বাক্ষর করে সংরক্ষণ করুন।
- "Digitally Signed Document" অংশের "Upload/ Remove" থেকে স্বাক্ষরিত ফাইল আপলোড করুন। "File Uploaded successfully" দেখালে উইন্ডো বন্ধ করুন।
- Remarks লিখে "Submit" চাপুন এবং নিশ্চিতকরণে "Yes" দিন।
প্রতিষ্ঠানের আইনি অবস্থা Proprietorship ছাড়া অন্য কিছু হলে এই পাতায় বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ তথ্যও দেখা যায়। কিছু ক্রয়কারী অভ্যন্তরীণ রেকর্ডের জন্য বাড়তি কাগুজে কপিতে স্বাক্ষর চাইতে পারেন, তবে তা পোর্টালের ডিজিটাল প্রক্রিয়ার বিকল্প নয়। পূর্ণ প্রক্রিয়া আছে অ্যাওয়ার্ড ও চুক্তি স্বাক্ষর অধ্যায়ে।
একটি পণ্য দরপত্রে সাতটি ফরম আছে: Tender Submission Letter, তিনটি কারিগরি ফরম, দুটি BoQ ফরম ও একটি মূল্য তফসিল। দরদাতা প্রথম দিন সাতটি ফরমই পূরণ করে প্রতিটির Sign, Encrypt ও Save সারলেন। তৃতীয় দিনে দুটি কারিগরি ফরমে ভুল পেয়ে Edit, Decrypt, সংশোধন ও Update করলেন। সময়সীমার দুই দিন আগে সাতটি ফরমের প্রতিটিতে চূড়ান্ত Encrypt and Save সেরে মিলিয়ে দেখলেন সব জায়গায় "Encrypted" লেখা আছে, তারপর টেন্ডার সিকিউরিটি নিশ্চিত করে Final Submission দিলেন। পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো টোকেন কেনা লাগেনি। দরপত্র জেতার পর শুধু চুক্তি স্বাক্ষরের সময় পোর্টাল থেকে Digital Signature Application নামাতে হলো।
পাসওয়ার্ড ও সাধারণ সমস্যা
- যেহেতু Password-ই প্রতিটি ফরমের স্বাক্ষরের চাবি, তাই এটি শক্তিশালী ও মনে রাখার মতো রাখুন। My Account থেকে পাসওয়ার্ড বদলাতে হলে তা ন্যূনতম ৮ অক্ষরের ও আলফানিউমেরিক হতে হয় (মাই অ্যাকাউন্ট)।
- "Verify Password" বারবার ব্যর্থ হলে Caps Lock দেখুন। কয়েকবার ভুলের পর অ্যাকাউন্ট সাময়িক লক হতে পারে, আর "Forgot Password" প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ।
- দীর্ঘক্ষণ নিষ্ক্রিয় থাকলে সেশন শেষ হয়ে কাজ হারাতে পারে; লম্বা ফরমে মাঝে মাঝে সংরক্ষণ করুন।
- এনক্রিপ্টেড পাতায় ব্রাউজারের Back বাটন নয়, পোর্টালের নিজস্ব বাটন ব্যবহার করুন।
- সব ফরমের পূর্ণ চক্র জমাদানের সময়সীমার অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে শেষ করুন।
- কোনো কারণে DSC নিতে চাইলে নির্দিষ্ট Certifying Authority, ফি বা সময় সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্যের জন্য BPPA-এর e-GP হেল্প ডেস্কে (১৬৫৭৫) যোগাযোগ করুন।
সংক্ষেপে
- নিবন্ধন ও দরপত্র জমার জন্য DSC কিনতে হয় না; e-GP Password-ই যথেষ্ট।
- প্রতিটি ফরমে আলাদাভাবে Sign, Encrypt ও Save করুন; সংশোধনের পর Update চাপুন।
- জমার আগে প্রতিটি ফরমে চূড়ান্ত Encrypt and Save করে "Encrypted" লেখা নিশ্চিত করুন।
- "Sign with PKI" ঐচ্ছিক; টোকেন সমস্যায় পাসওয়ার্ড-চক্রই ভরসা।
- চুক্তি স্বাক্ষরে পোর্টালের Digital Signature Application দিয়ে স্বাক্ষর করে আপলোড করুন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
e-GP নিবন্ধনের জন্য কি DSC লাগে?
ফরমের "Sign with PKI" বাটন কি চাপতেই হবে?
কোনো ফরমে "Encrypted" না দেখালে কী হবে?
চুক্তি স্বাক্ষরে কোন সফটওয়্যার লাগে?
Password ভুলে গেলে দরপত্রের ফরমে কী সমস্যা হয়?
সম্পর্কিত পাতা
টেন্ডার প্রস্তুতি ও ফরম
ফরম পূরণ, Sign ও Encrypt।
জমাদান ও প্রত্যাহার
Final Submission ও পরবর্তী পরিবর্তন।
অ্যাওয়ার্ড ও চুক্তি স্বাক্ষর
Digital Signature Application দিয়ে স্বাক্ষর।
তথ্যসূত্র
- National e-GP Portal — eprocure.gov.bd
- Bangladesh Public Procurement Authority (BPPA) — e-GP
- Bangladesh e-Government Procurement (e-GP) Guidelines (Revised), 2025
সর্বশেষ হালনাগাদ: অক্টোবর ২০২৬ · টেন্ডার জমা দেওয়ার আগে সর্বদা eprocure.gov.bd-এর মূল নথি যাচাই করুন।
রায়হান খান গত ১০ বছর ধরে সরকারি ক্রয় ক্ষেত্রে কাজ করছেন — বাংলাদেশজুড়ে ক্লায়েন্টদের জন্য টেন্ডার প্রস্তুত, পর্যালোচনা ও জমা দেওয়ার কাজ করে আসছেন। বাংলাদেশে ই-প্রকিউরমেন্ট শুরুর একদম প্রথম দিন থেকেই তিনি ই-জিপি সিস্টেমে হাতে-কলমে কাজ করে আসছেন এবং পূর্ববর্তী PPR 2008 থেকে বর্তমান PPR 2025 পর্যন্ত, টেন্ডার ডকুমেন্টেশনের প্রয়োজনীয়তা, মূল্যায়ন মানদণ্ড, এবং NCT ও ICT উভয় পদ্ধতিতে দরপত্র জমাদানের বাস্তব চিত্র সম্পর্কে গভীর ব্যবহারিক বোঝাপড়া গড়ে তুলেছেন। ঠিকাদার ও পরামর্শকরা প্রতিদিন যে অনুসন্ধান-জনিত ঝামেলার মুখোমুখি হতেন, তা দূর করতেই তিনি ই-জিপি বাংলা প্রতিষ্ঠা করেন।
