পারফরম্যান্স সিকিউরিটি ও রিটেনশন মানি
দরপত্র জেতার আনন্দের পরপরই ঠিকাদারের সামনে আসে দুটি আর্থিক বাধ্যবাধকতা: চুক্তি স্বাক্ষরের আগে পারফরম্যান্স সিকিউরিটি (Performance Security) জমা দেওয়া, এবং চুক্তি চলাকালে প্রতিটি বিল থেকে রিটেনশন মানি (Retention Money) কেটে রাখা। দুটিই জামানত, কিন্তু কখন, কত এবং কীভাবে ফেরত আসে, তা সম্পূর্ণ আলাদা। এই লেখায় PPR 2025-এর বিধি ৩৬ ও ৩৭ অনুযায়ী দুটির হার, প্রক্রিয়া ও নগদ প্রবাহের প্রভাব ব্যাখ্যা করা হলো।
পারফরম্যান্স সিকিউরিটি NOA পাওয়ার পর চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বশর্ত হিসেবে একবারে জমা দিতে হয়, সাধারণত চুক্তিমূল্যের ৫% থেকে ১০% (ক্রয়ের প্রকৃতিভেদে)। রিটেনশন মানি বিল থেকে কেটে রাখা চলমান জামানত: নির্মাণকাজ ও ভৌতসেবায় ৫%, পণ্যে ১০%। ত্রুটিজনিত দায়ের মেয়াদ (DLP) শেষে ত্রুটি সংশোধন সনদ ইস্যুর পর ২৮ দিনের মধ্যে রিটেনশন ফেরত দিতে হয়।
টেন্ডার সিকিউরিটি, পারফরম্যান্স সিকিউরিটি ও রিটেনশন: তিনটি আলাদা জামানত
টেন্ডার সিকিউরিটি জমা দেওয়া হয় দরপত্র জমাদানের আগে, যাতে দরদাতা মাঝপথে সরে না যান। পারফরম্যান্স সিকিউরিটি আসে জেতার পর, যাতে চুক্তির কাজ ঠিকমতো সম্পন্ন হয়। আর রিটেনশন মানি চুক্তি চলাকালে বিল থেকে কাটা হয়, যাতে কাজ শেষে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে তা সংশোধনের নিশ্চয়তা থাকে।
ই-জিপির Payment ট্যাবেও এই পার্থক্য স্পষ্ট: Tender Security পরিশোধ করতে হয় Final Submission-এর আগে, আর Performance Security পরিশোধ করতে হয় Contract Signing-এর আগে। টেন্ডার সিকিউরিটির হিসাব নিয়ে আলাদা লেখা আছে: টেন্ডার সিকিউরিটি কীভাবে হিসাব করা হয়।
পারফরম্যান্স সিকিউরিটির হার (বিধি ৩৬)
PPR 2025-এর তফসিল-২ অনুযায়ী সাধারণ হার নিচের মতো। তবে যেকোনো নির্দিষ্ট দরপত্রে TDS/BDS ও NOA-তে লেখা অঙ্কই চূড়ান্ত।
| ক্রয়ের প্রকৃতি | পারফরম্যান্স সিকিউরিটি | বিধি |
|---|---|---|
| পণ্য (বিভাজ্য) | চুক্তিমূল্যের ৫% | ৩৬(১) |
| পণ্য (সাধারণ) | চুক্তিমূল্যের ১০% | ৩৬(১) |
| নির্মাণকাজ (অগ্রিম ছাড়া) | ৫%, তবে ৳১ কোটির নিচের চুক্তিতে মওকুফ | ৩৬(১) |
| ভৌতসেবা | ৫% | ৩৬(১) |
| বুদ্ধিবৃত্তিক ও পেশাগত সেবা | সর্বোচ্চ ৩% থেকে ৫% | ৩৬(৯) |
৳১ কোটির নিচের নির্মাণকাজে পারফরম্যান্স সিকিউরিটি মওকুফ হওয়া ছোট ঠিকাদারদের নগদ প্রবাহের জন্য বড় স্বস্তি। আবার কোনো দরদাতা অস্বাভাবিক কম দর দিলে PE অতিরিক্ত সুরক্ষা হিসেবে সর্বোচ্চ ২৫% পর্যন্ত ফ্রন্ট-লোডিং সিকিউরিটি চাইতে পারে (বিধি ৩৬(২))। অস্বাভাবিক কম দর কীভাবে চিহ্নিত হয়, তা জানতে SLT সূত্র দেখুন।
NOA পাওয়ার পর পারফরম্যান্স সিকিউরিটি জমার প্রক্রিয়া
বিধি ১২৩(২) অনুযায়ী NOA-তে পারফরম্যান্স সিকিউরিটির পরিমাণ, তার ছক বা ফরম্যাট এবং জমা দেওয়ার সময়সীমা বাধ্যতামূলকভাবে উল্লেখ থাকে। দিনসংখ্যা প্রতিটি ক্রয়ে ভিন্ন হতে পারে, তাই অনুমান না করে NOA-র PDF কপি সংরক্ষণ করে সেখানকার তারিখ ক্যালেন্ডারে টুকে রাখুন। এরপর:
- NOA পাওয়া মাত্র নিজের e-GP এনলিস্টেড ব্যাংকে NOA কপি নিয়ে আবেদন শুরু করুন। Edit Bank Details শেষ হওয়ার অপেক্ষা না করে কাজ দুটি সমান্তরালে চালান।
- BDS/TDS বা GCC/SCC-তে দেওয়া নির্ধারিত প্রোফর্মা ব্যাংককে দিন। ভুল ফরম্যাটে ইস্যু হলে PE গ্রহণ নাও করতে পারে।
- ইনস্ট্রুমেন্ট হাতে পেলে Branch Maker-কে দিয়ে সিস্টেমে এন্ট্রি করান এবং Branch Checker-এর অনুমোদন নিন।
- Payment ট্যাবের Performance Security সাব-ট্যাবে স্ট্যাটাস "Paid" দেখালে তবেই ধাপটি সম্পন্ন।
STD e-PG4-এর অধীনে একাধিক মুদ্রায় (যেমন BDT ও USD) দর দিয়ে থাকলে পারফরম্যান্স সিকিউরিটিও সেই একই মুদ্রাগুলোতে ভাগ করে দিতে হয়। পুরো NOA-পরবর্তী ধাপক্রম পাবেন NOA থেকে চুক্তি স্বাক্ষর লেখায় এবং চুক্তি স্বাক্ষর ম্যানুয়ালে।
বড় অঙ্ক, কম সময়: ব্যাংকের সাথে আগাম প্রস্তুতি
টেন্ডার সিকিউরিটি সাধারণত আনুমানিক মূল্যের ২% থেকে ৩%, কিন্তু পারফরম্যান্স সিকিউরিটি চুক্তিমূল্যের ৫% থেকে ১০% পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায়ই কয়েক গুণ বড়। এত বড় ব্যাংক গ্যারান্টি ইস্যুর আগে ব্যাংক ঋণসীমা ও জামানত আরও কড়াভাবে যাচাই করে, অথচ NOA থেকে চুক্তি স্বাক্ষর পর্যন্ত সময় সাধারণত অনেক কম।
সমাধান হলো দরপত্রে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তের সময়েই নিজের ব্যাংকের সাথে কথা বলে রাখা: জিতলে এত বড় অঙ্কের গ্যারান্টি অল্প সময়ে পাওয়া যাবে কিনা। বিলম্বের ঝুঁকি দেখা দিলে দেরি না করে PE-কে লিখিতভাবে জানান। সময় বাড়ানো PE-র এখতিয়ার, নিশ্চয়তা নেই।
ব্যর্থ হলে বা জাল জামানত দিলে কী হয়
নির্ধারিত সময়ে পারফরম্যান্স সিকিউরিটি দিতে না পারলে বিধি ১২৩(১১) অনুযায়ী PE পরবর্তী সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দরদাতার সাথে চুক্তির ব্যবস্থা নেয়, অর্থাৎ জেতা চুক্তি হাতছাড়া হয়। এটি টেন্ডার সিকিউরিটি বাজেয়াপ্ত হওয়ারও অন্যতম প্রধান কারণ (বিস্তারিত: টেন্ডার সিকিউরিটি বাজেয়াপ্ত হওয়ার কারণ)।
চুক্তি স্বাক্ষরের আগে PE ইস্যুকারী ব্যাংক শাখায় লিখিত অনুরোধ পাঠিয়ে জামানতের সত্যতা যাচাই করতে পারে (বিধি ১২৩(৮) থেকে (১০))। জামানত যথার্থ প্রমাণিত না হলে টেন্ডার সিকিউরিটি বাজেয়াপ্ত হয় এবং আইনের ধারা ৬৪ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাই মধ্যস্থতাকারী বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সংগৃহীত কোনো গ্যারান্টি কখনো ব্যবহার করবেন না। চুক্তি মাঝপথে সমাপ্ত (terminate) হলেও পারফরম্যান্স সিকিউরিটি বাজেয়াপ্ত হতে পারে।
রিটেনশন মানি কীভাবে কাটা হয় (বিধি ৩৭)
রিটেনশন মানি আলাদাভাবে জমা দিতে হয় না, এটি পেমেন্ট থেকেই কেটে রাখা হয়:
- নির্মাণকাজ ও ভৌতসেবা: প্রতিটি কিস্তি বা Interim Bill থেকে ৫%।
- পণ্য: ১০%, তফসিল-২ অনুযায়ী চূড়ান্ত বিল থেকে কর্তনযোগ্য। ফলে পণ্যে প্রথম দিকের বিল প্রায় পূর্ণ অঙ্কে আসে, শেষ বিলে বড় কর্তন হয়।
- বুদ্ধিবৃত্তিক ও পেশাগত সেবা: তফসিল-২-এ রিটেনশনের কোনো হার নেই। এখানে পারফরম্যান্স সিকিউরিটিই মূল জামানত, যা Final Report গৃহীত হওয়ার পর অবমুক্ত হয়।
প্রতিটি বিল থেকে কাটা রিটেনশন একটি একক ক্রমপুঞ্জিত ব্যালেন্স হিসেবে জমা হয়, প্রতি মাসে আলাদাভাবে ফেরত আসে না। কোনো অগ্রিম দেওয়া না হলে রিটেনশন ও পারফরম্যান্স সিকিউরিটি মিলিয়ে চুক্তিমূল্যের ১০%-এর বেশি হতে পারবে না। একই বিল থেকে ভ্যাট, এআইটি ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অগ্রিম আদায়ও কাটা হয়, তাই নগদ প্রবাহ সব কর্তন মিলিয়ে পরিকল্পনা করুন। বিল ও পেমেন্ট ব্যবস্থাপনা নিয়ে দেখুন চুক্তি ব্যবস্থাপনা ও e-CMS গাইড।
ধরা যাক একটি OTM নির্মাণকাজের চুক্তিমূল্য ৳৩,০০,০০,০০০ এবং কোনো অগ্রিম নেই। পারফরম্যান্স সিকিউরিটি ৫% অর্থাৎ ৳১৫,০০,০০০, যা চুক্তি স্বাক্ষরের আগে ব্যাংক গ্যারান্টি হিসেবে জমা পড়বে। কাজ চলাকালে ৳৫০,০০,০০০-এর একটি Interim Bill এলে সেখান থেকে ৫% অর্থাৎ ৳২,৫০,০০০ রিটেনশন কাটা হবে (ভ্যাট ও এআইটি আলাদা)। পুরো চুক্তি শেষে মোট রিটেনশন দাঁড়াবে প্রায় ৳১৫,০০,০০০। দুটি মিলিয়ে ৳৩০,০০,০০০, অর্থাৎ চুক্তিমূল্যের ঠিক ১০%, যা অগ্রিমবিহীন চুক্তির সর্বোচ্চ সীমার মধ্যে। ৳৮০,০০,০০০-এর অগ্রিমবিহীন নির্মাণকাজ হলে অবশ্য পারফরম্যান্স সিকিউরিটিই মওকুফ।
রিটেনশন ফেরত: DLP, ত্রুটি সংশোধন সনদ ও ২৮ দিন
ত্রুটিজনিত দায়ের মেয়াদ (Defects Liability Period, DLP) হলো কাজ সমাপ্তির পর চুক্তিতে নির্ধারিত একটি সময়, যার মধ্যে ঠিকাদার নিজ খরচে ত্রুটি সংশোধন করতে বাধ্য। এই মেয়াদে ত্রুটি ধরা পড়লে PM নোটিশ দেন এবং ত্রুটি সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত DLP সম্প্রসারিত থাকে (বিধি ৫১(৭))। সংশোধন না করলে PM নিজে ব্যবস্থা নিয়ে সেই খরচ ঠিকাদারের কাছ থেকে আদায় করেন।
বিধি ৩৭(২) অনুযায়ী ত্রুটি সংশোধন সনদ (Defects Correction Certificate), অথবা কোনো ত্রুটি না থাকলে শূন্য ত্রুটি সনদ (Zero-Defect Certificate) ইস্যুর পর ২৮ দিনের মধ্যে সমুদয় রিটেনশন মানি ফেরত দিতে হয়। অর্থাৎ শুধু ক্যালেন্ডারের মেয়াদ পার হওয়াই যথেষ্ট নয়, সনদ ইস্যুই আসল ট্রিগার। তাই DLP-এর শেষদিকে নিজে PM-কে চূড়ান্ত যৌথ পরিদর্শনের অনুরোধ করুন।
সংক্ষেপে
- পারফরম্যান্স সিকিউরিটি NOA-র পর, চুক্তি স্বাক্ষরের আগে, একবারে জমা দিতে হয়।
- হার: বিভাজ্য পণ্য ৫%, সাধারণ পণ্য ১০%, নির্মাণকাজ ও ভৌতসেবা ৫%, পেশাগত সেবা সর্বোচ্চ ৩% থেকে ৫%।
- ৳১ কোটির নিচের অগ্রিমবিহীন নির্মাণকাজে পারফরম্যান্স সিকিউরিটি মওকুফ।
- রিটেনশন: নির্মাণকাজ ও ভৌতসেবায় প্রতি বিলে ৫%, পণ্যে ১০%, পেশাগত সেবায় নেই।
- অগ্রিম না থাকলে রিটেনশন ও পারফরম্যান্স সিকিউরিটি মিলিয়ে চুক্তিমূল্যের ১০%-এর বেশি নয়।
- ত্রুটি সংশোধন বা শূন্য ত্রুটি সনদের পর ২৮ দিনের মধ্যে রিটেনশন ফেরত।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
পারফরম্যান্স সিকিউরিটি কখন জমা দিতে হয়?
ছোট নির্মাণকাজে কি পারফরম্যান্স সিকিউরিটি লাগে?
রিটেনশন মানি কি প্রতি মাসে ফেরত পাওয়া যায়?
পরামর্শক সেবায় কি রিটেনশন মানি কাটা হয়?
সময়মতো পারফরম্যান্স সিকিউরিটি দিতে না পারলে কী হয়?
সম্পর্কিত পাতা
মূল্যসীমা ও সময়সীমা
সব জামানত, হার ও সময়সীমা এক জায়গায়।
NOA ও চুক্তি স্বাক্ষর
পুরস্কার থেকে চুক্তি স্বাক্ষরের পোর্টাল-ধাপ।
চুক্তি ব্যবস্থাপনা
বিল, পেমেন্ট ও চুক্তি সমাপ্তি।
e-CMS গাইড
ই-জিপিতে চুক্তি বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনা।
তথ্যসূত্র
- National e-GP Portal — eprocure.gov.bd
- Bangladesh Public Procurement Authority (BPPA) — e-GP
- Bangladesh e-Government Procurement (e-GP) Guidelines (Revised), 2025
সর্বশেষ হালনাগাদ: অক্টোবর ২০২৬ · টেন্ডার জমা দেওয়ার আগে সর্বদা eprocure.gov.bd-এর মূল নথি যাচাই করুন।
রায়হান খান গত ১০ বছর ধরে সরকারি ক্রয় ক্ষেত্রে কাজ করছেন — বাংলাদেশজুড়ে ক্লায়েন্টদের জন্য টেন্ডার প্রস্তুত, পর্যালোচনা ও জমা দেওয়ার কাজ করে আসছেন। বাংলাদেশে ই-প্রকিউরমেন্ট শুরুর একদম প্রথম দিন থেকেই তিনি ই-জিপি সিস্টেমে হাতে-কলমে কাজ করে আসছেন এবং পূর্ববর্তী PPR 2008 থেকে বর্তমান PPR 2025 পর্যন্ত, টেন্ডার ডকুমেন্টেশনের প্রয়োজনীয়তা, মূল্যায়ন মানদণ্ড, এবং NCT ও ICT উভয় পদ্ধতিতে দরপত্র জমাদানের বাস্তব চিত্র সম্পর্কে গভীর ব্যবহারিক বোঝাপড়া গড়ে তুলেছেন। ঠিকাদার ও পরামর্শকরা প্রতিদিন যে অনুসন্ধান-জনিত ঝামেলার মুখোমুখি হতেন, তা দূর করতেই তিনি ই-জিপি বাংলা প্রতিষ্ঠা করেন।
