NOA পাওয়ার পর চুক্তি স্বাক্ষর পর্যন্ত করণীয় ও সময়সীমা
মূল্যায়নে সর্বনিম্ন মূল্যায়িত গ্রহণযোগ্য দরদাতা হলে ই-জিপিতে আসে NOA (Notification of Award)। অনেকে ভাবেন এখানেই কাজ শেষ, কিন্তু আসলে শুরু হয় একটি কড়া সময়ের দৌড়: ব্যাংক তথ্য নিশ্চিত করা, পারফরম্যান্স সিকিউরিটি জমা, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ প্রকাশ এবং ডিজিটাল স্বাক্ষরে চুক্তি সম্পাদন। এই লেখায় NOA থেকে "Contract Awarded" পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ, সময়সীমা ও ঝুঁকি ক্রমানুসারে সাজানো হলো।
মূল্যায়ন অনুমোদনের ৩ কর্মদিবসের মধ্যে NOA দিতে হয় এবং ই-জিপি তা দরদাতার পক্ষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রহণ করে নেয়। এরপর ক্রমানুসারে: Edit Bank Details ও Witness Information, NOA-তে লেখা সময়ের মধ্যে পারফরম্যান্স সিকিউরিটি, ৳১০ লক্ষের বেশি চুক্তিতে বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ, এবং Digital Signature Application দিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর। PE স্বাক্ষর করলে স্ট্যাটাস হয় "Contract Awarded"।
NOA, Letter for Contract Signing ও Letter of Acceptance
ক্রয়ের প্রকৃতিভেদে পুরস্কার-নথির নাম আলাদা, কিন্তু ভেতরের তথ্য ও পরবর্তী প্রক্রিয়া একই:
| ক্রয়ের প্রকৃতি | পুরস্কার-নথির নাম |
|---|---|
| পণ্য (Goods) | Notification of Award (NOA) |
| নির্মাণকাজ (Works) | Notification of Award (NOA) |
| সেবা (Services) | Letter for Contract Signing |
| ভৌতসেবা (Physical Services) | Letter of Acceptance |
বিধি ৪৮(৫)(ক) অনুযায়ী মূল্যায়ন অনুমোদনের ৩ কর্মদিবসের মধ্যে NOA প্রদান করতে হয়। PE ইস্যু করার সাথে সাথেই সিস্টেম তা দরদাতার পক্ষে গৃহীত হিসেবে গণ্য করে, আলাদা কোনো "Accept" বাটন নেই। অন্য দরদাতারাও NOA-র বিস্তারিত দেখতে পান।
NOA-তে কী থাকে এবং কেন সেটি বাঁধনযুক্ত
বিধি ১২৩(২) অনুযায়ী NOA-তে বাধ্যতামূলকভাবে থাকে: দরপত্র গ্রহণের তথ্য, চুক্তিমূল্য, পারফরম্যান্স সিকিউরিটির পরিমাণ ও ফরম্যাট, সেটি দাখিলের সময়সীমা, এবং চুক্তি স্বাক্ষরের তারিখ ও সময়। NOA হাতে পাওয়া মাত্র "View" থেকে পুরো নথি দেখে Save as PDF করে রাখুন এবং দুটি সময়সীমা (সিকিউরিটি জমা ও চুক্তি স্বাক্ষর) আলাদাভাবে ক্যালেন্ডারে লিখুন। দিনসংখ্যা প্রতিটি ক্রয়ে ভিন্ন হতে পারে, তাই কোনো সাধারণ সংখ্যা ধরে নেবেন না।
বিধি ১২৩(৪) অনুযায়ী NOA জারির মাধ্যমেই ক্রয়কারী ও দরদাতার মধ্যে একটি চুক্তি বলবৎ হয়ে যায়, পরের আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর সেটিকে লিখিত রূপ দেয় মাত্র। এই পর্যায়ে মূল্য, স্পেসিফিকেশন বা সময়সূচি নিয়ে নতুন দর কষাকষির সুযোগ নেই (বিধি ১২০)। ব্যতিক্রম শুধু যেখানে Negotiation ট্যাবে আনুষ্ঠানিক আলোচনা আগেই হয়েছে, যেমন DPM-এ পণ্য ক্রয়, সেবা ও ভৌতসেবা। প্রশাসনিক ভুল (নাম, ঠিকানা) থাকলে Private Forum-এ সংশোধন চাওয়া যায়।
ধাপ ১: Edit Bank Details ও Witness Information
স্বয়ংক্রিয় গ্রহণের পর ড্যাশবোর্ডে নতুন কাজের তালিকা আসে। প্রথম কাজ "Edit Bank Details": ড্রপ-ডাউন থেকে Beneficiary Name বেছে নিন, যা আপনার নিবন্ধিত ব্যাংক হিসাবের সাথে যুক্ত, তারপর Witness Information (সাক্ষীর তথ্য) যোগ করে Submit করুন। এই ধাপ বাদ থাকলে পরের ধাপগুলো বাধাগ্রস্ত হতে পারে, তাই NOA আসার দিনই কাজটি সেরে ফেলুন।
ধাপ ২: পারফরম্যান্স সিকিউরিটি জমা
NOA-তে লেখা সময়ের মধ্যে e-GP এনলিস্টেড ব্যাংকের মাধ্যমে পারফরম্যান্স সিকিউরিটি জমা দিতে হয়: Branch Maker এন্ট্রি দেন, Branch Checker অনুমোদন করেন, তারপর Payment ট্যাবের Performance Security সাব-ট্যাবে "Paid" দেখায়। হার সাধারণত চুক্তিমূল্যের ৫% থেকে ১০%, তবে ৳১ কোটির নিচের অগ্রিমবিহীন নির্মাণকাজে মওকুফ। হার, প্রক্রিয়া ও রিটেনশন মানির বিস্তারিত পাবেন পারফরম্যান্স সিকিউরিটি ও রিটেনশন মানি লেখায়।
ব্যাংকে Edit Bank Details শেষ হওয়ার অপেক্ষা না করে NOA পাওয়ার দিনই আবেদন শুরু করুন। চুক্তি স্বাক্ষরের আগে PE ইস্যুকারী ব্যাংকে লিখিত অনুরোধ পাঠিয়ে জামানতের সত্যতা যাচাই করতে পারে (বিধি ১২৩(৮) থেকে (১০)), তাই শুধু নিজের ব্যাংক থেকে সরাসরি ইস্যু করা গ্যারান্টিই ব্যবহার করুন।
ধাপ ৩: বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ প্রকাশ
বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ মানে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ বা সুবিধাভোগের সাথে যুক্ত প্রকৃত ব্যক্তিদের তথ্য। ই-জিপিতে এই তথ্য ছাড়া কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে না। নিবন্ধনের সময় তথ্য না দিয়ে থাকলে Edit Profile-এর Company Details অংশে মালিকদের নাম ও শেয়ার-শতাংশ দিন, সহায়ক নথি আপলোড করে Save করুন। শতাংশের যোগফল ঠিক ১০০% না হলে সিস্টেম ফরম গ্রহণ করে না।
ধারা ২১(১) ও বিধি ৪৯(২) থেকে (৩) (২০২৬ সংশোধনী) অনুযায়ী ৳১০ লক্ষের বেশি মূল্যের চুক্তিতে বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ তথ্য চুক্তি স্বাক্ষরের ৩ দিনের মধ্যে প্রকাশ করতে হয় এবং ন্যূনতম ১ মাস প্রকাশিত রাখতে হয়। প্রতিষ্ঠান Proprietorship না হয়ে Partnership বা লিমিটেড কোম্পানি হলে এই তথ্য Contract Signing পৃষ্ঠাতেও দেখা যায়। বিস্তারিত: বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ।
ধাপ ৪: ডিজিটাল স্বাক্ষরে চুক্তি সম্পাদন
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখুন: দরপত্র প্রস্তুতির সময় ফরমে যে পাসওয়ার্ড-ভিত্তিক Sign/Encrypt ব্যবহার করেছেন, চুক্তি স্বাক্ষরের Digital Signature Application তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি সফটওয়্যার, যা কম্পিউটারে ইনস্টল করতে হয়।
- "Contract Signing" ট্যাবে গিয়ে "Click Here" লিংক থেকে টুলটি ডাউনলোড ও ইনস্টল করুন।
- PE খসড়া চুক্তি তৈরি করলে "View" থেকে খুলে Save as PDF দিয়ে ডাউনলোড করুন।
- Digital Signature Application দিয়ে ফাইলটিতে স্বাক্ষর করে সংরক্ষণ করুন।
- "Upload/ Remove" অংশে স্বাক্ষরিত ফাইল আপলোড করুন, "File Uploaded successfully" দেখে উইন্ডো বন্ধ করুন।
- Remarks লিখে Submit চাপুন এবং নিশ্চিতকরণ পপ-আপে "Yes" দিন।
PE নিজের পক্ষে স্বাক্ষর করলে স্ট্যাটাস হয় "Contract Awarded" এবং চুক্তিটি ই-জিপি ওয়েবসাইটের "e-Contract" ট্যাবে প্রকাশিত হয়। চুক্তিপত্র সাধারণত Stamp Act, 1899-এর অধীন স্ট্যাম্প শুল্কের আওতাভুক্ত। কোন পক্ষ এই শুল্ক বহন করবে তা খসড়া চুক্তিতে লেখা থাকে, স্বাক্ষরের আগে পড়ে নিন এবং হার জানতে PE বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাথে যোগাযোগ করুন।
ধরা যাক একটি পণ্য সরবরাহের দরপত্রে চুক্তিমূল্য ৳৪৫,০০,০০০ এবং NOA এল ৫ তারিখে। NOA-তে লেখা আছে পারফরম্যান্স সিকিউরিটি জমার শেষ তারিখ ১৯ এবং চুক্তি স্বাক্ষরের তারিখ ২৪ (এই তারিখগুলো শুধু উদাহরণ)। দরদাতা ৫ তারিখেই Edit Bank Details শেষ করলেন এবং NOA-র PDF নিয়ে ব্যাংকে ১০% অর্থাৎ ৳৪,৫০,০০০-এর গ্যারান্টির আবেদন করলেন। ১২ তারিখে গ্যারান্টি হাতে পেয়ে Branch Maker ও Checker-এর ধাপ শেষ হলো ১৩ তারিখে। চুক্তিমূল্য ৳১০ লক্ষের বেশি হওয়ায় একই সপ্তাহে Edit Profile-এ বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ হালনাগাদ করলেন, এবং আগেভাগে Digital Signature Application ইনস্টল করে রাখলেন। ফলে খসড়া চুক্তি আসার পর এক বসাতেই স্বাক্ষর সম্পন্ন হলো।
সময়সীমা পার হলে কী হয়
বিধি ১২৩(১১) অনুযায়ী বিজয়ী দরদাতা নির্ধারিত সময়ে পারফরম্যান্স সিকিউরিটি দিতে বা চুক্তি স্বাক্ষর করতে ব্যর্থ হলে PE পরবর্তী সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দরদাতার সাথে চুক্তির ব্যবস্থা নেয়, তাও ফলপ্রসূ না হলে পর্যায়ক্রমে বাকিদের সাথে। বাকি দর প্রাক্কলনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হলে পুনঃদরপত্রের সুপারিশ হতে পারে (দেখুন টেন্ডার বাতিল ও পুনঃটেন্ডার)।
বিজয়ীর জন্য এর মানে চুক্তি হারানো, আর প্রায়ই টেন্ডার সিকিউরিটিও বাজেয়াপ্ত হওয়া (বিস্তারিত)। আবার দ্বিতীয় বা তৃতীয় অবস্থানে থাকা দরদাতার জন্য এর মানে, NOA না পাওয়া পর্যন্তও নিজের ব্যাংকিং প্রস্তুতি রেখে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর: টেন্ডার সিকিউরিটি মুক্ত করা
চুক্তি স্বাক্ষরের পর PE চুক্তি নথি আপলোড করলে Tender Security Release ও Tender Security Extension Release অনুরোধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে Branch Checker-এর কাছে চলে যায়। কিন্তু প্রক্রিয়াটি নিজে নিজে শেষ হয় না: আপনাকে ব্যাংক শাখায় সশরীরে গিয়ে Branch Checker-কে রিলিজ সম্পন্ন করার অনুরোধ জানাতে হবে, নইলে সিকিউরিটি অনির্দিষ্টকাল আটকে থাকতে পারে। এরপর কাজ শুরুর ধাপ, অর্থাৎ মোবিলাইজেশন ও e-CMS-এ চুক্তি বাস্তবায়ন, নিয়ে জানতে দেখুন চুক্তি ব্যবস্থাপনা।
সংক্ষেপে
- মূল্যায়ন অনুমোদনের ৩ কর্মদিবসের মধ্যে NOA, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গৃহীত হয়।
- NOA জারিতেই চুক্তি বলবৎ, মূল শর্তে নতুন দর কষাকষির সুযোগ নেই।
- NOA-র PDF সংরক্ষণ করে সিকিউরিটি ও স্বাক্ষরের দুটি তারিখ ক্যালেন্ডারে লিখুন।
- একই দিনে Edit Bank Details এবং ব্যাংকে পারফরম্যান্স সিকিউরিটির আবেদন।
- ৳১০ লক্ষের বেশি চুক্তিতে বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ, স্বাক্ষরের ৩ দিনের মধ্যে প্রকাশ।
- ব্যর্থ হলে চুক্তি পরবর্তী সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দরদাতার কাছে যায়।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
NOA কি আলাদাভাবে Accept করতে হয়?
NOA পাওয়ার পর কি দর বা শর্ত নিয়ে আলোচনা করা যায়?
বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ কখন প্রকাশ করতে হয়?
চুক্তি স্বাক্ষরে কোন ডিজিটাল স্বাক্ষর লাগে?
চুক্তি স্বাক্ষরের পর টেন্ডার সিকিউরিটি কীভাবে ফেরত পাব?
সম্পর্কিত পাতা
NOA ও চুক্তি স্বাক্ষর ম্যানুয়াল
পোর্টালে প্রতিটি ধাপের বিবরণ।
বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ
কারা প্রকৃত মালিক, কীভাবে প্রকাশ করবেন।
চুক্তি ব্যবস্থাপনা
চুক্তি স্বাক্ষরের পর বাস্তবায়ন।
DPM (Direct Procurement)
আলোচনার মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি।
তথ্যসূত্র
- National e-GP Portal — eprocure.gov.bd
- Bangladesh Public Procurement Authority (BPPA) — e-GP
- Bangladesh e-Government Procurement (e-GP) Guidelines (Revised), 2025
সর্বশেষ হালনাগাদ: অক্টোবর ২০২৬ · টেন্ডার জমা দেওয়ার আগে সর্বদা eprocure.gov.bd-এর মূল নথি যাচাই করুন।
রায়হান খান গত ১০ বছর ধরে সরকারি ক্রয় ক্ষেত্রে কাজ করছেন — বাংলাদেশজুড়ে ক্লায়েন্টদের জন্য টেন্ডার প্রস্তুত, পর্যালোচনা ও জমা দেওয়ার কাজ করে আসছেন। বাংলাদেশে ই-প্রকিউরমেন্ট শুরুর একদম প্রথম দিন থেকেই তিনি ই-জিপি সিস্টেমে হাতে-কলমে কাজ করে আসছেন এবং পূর্ববর্তী PPR 2008 থেকে বর্তমান PPR 2025 পর্যন্ত, টেন্ডার ডকুমেন্টেশনের প্রয়োজনীয়তা, মূল্যায়ন মানদণ্ড, এবং NCT ও ICT উভয় পদ্ধতিতে দরপত্র জমাদানের বাস্তব চিত্র সম্পর্কে গভীর ব্যবহারিক বোঝাপড়া গড়ে তুলেছেন। ঠিকাদার ও পরামর্শকরা প্রতিদিন যে অনুসন্ধান-জনিত ঝামেলার মুখোমুখি হতেন, তা দূর করতেই তিনি ই-জিপি বাংলা প্রতিষ্ঠা করেন।
